ফোর্বস ম্যাগাজিনের জন্য সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ৫০ টি স্থান নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন ভ্রমন বিশেষজ্ঞ লরা বেগলি ব্লুম। ২০১৯ সালে বিগ সেভেন ট্রাভেল ওয়েবসাইট অবলম্বনে ব্লুমের লিখিত এই প্রতিবেদনটি অসংখ্য ভ্রমনপিয়াসী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভ্রমন মানে শুধু কতগুলো ফোটো তোলাতুলি নয় এরকম মনে করা লোকেদের অনেকেই ব্লুমের তালিকা দেখে নিজ-নিজ বাজেট মোতাবেক বছর ভ্রমন তালিকা প্রস্তুত করেন। ব্লুমের উল্লেখিত স্থানগুলোর উপরে অনলাইন অনুসন্ধান চালিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন তৈরি করে জীবনজয়ী টিম। মোট ১০ টি পর্বে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবে।
পর্বঃ চার
১৬। জয়পুর, ভারতঃ
জয়পুর ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ একটি শহর। এটি ভারতের সবথেকে বড় রাজ্য রাজস্থানের রাজধানী। এই শহরটিকে গোলাপী শহর বলা হয়। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এই শহরে রয়েছে অনন্য সাধারণ কিছু প্রাচীন নিদর্শন। এই শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে যন্তর মন্তর, সিটি প্যালেস,হাওয়া মহল ও বিড়লা মন্দির। শহরের বহির্ভাগে রয়েছে আমের কেল্লা, জয়গড় কেল্লা ও নাহারগড় কেল্লা। এছাড়া রয়েছে জয়পুরের সবথেকে আকর্ষনীয় স্থান জলমহল। এটি মুঘল ও রাজপুত রাজাদের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য। জয়পুর শহর ২০১৯ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ লরা বেগলে ব্লুম এর বাকেট লিস্ট ট্রাভেল এর পৃথিবীর সেরা ৫০ টি স্থানের মধ্যে ১৬ তম স্থান দখল করে নেয়।
ঘুরে দেখা দুনিয়া লরা বেগলির তালিকা (তৃতীয় পর্ব)
১৭। ওয়াইকাতু নিউজিল্যান্ডঃ
অইকাতু নিউজিল্যান্ডের উত্তরে অবস্থিত একটি সুন্দর শহর যেটি Bucket list travel এর ১৭ তম স্থান দখল করেছিল এটি মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে কিছু চোখ ধাধানো বাগান,কয়েকটি ভুগর্ভস্থ গুহা,কালো বালির সমুদ্র,ঘুর্ণায়মান সবুজ পাহাড় ও লর্ড অব দ্যা রিংস এর আইকনিক হবিটন মুভি সেট। এখানে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য স্পটগুলো হলো: হবিটন মুভি সেট, অয়াইতম গুহা, রাগলান সমুদ্র সৈকত, হ্যামিল্টন গার্ডেন, ওয়াইকাতু নদী ইত্যাদি।
১৮। হাভানা, কিউবাঃ
কিউবার রাজধানী হাভানা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি শহর। এই শহরের মানুষের আতিথেয়তা, পুরাতন গাড়ি, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। এই শহরে অনেকগুলি দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেটি সহজেই পর্যটকদের নজর কাড়ে। এই শহরের দর্শীয় স্থানগুলোর মধ্য পুরাতন হাভানা,প্লা দে লা ক্যাটেড্রাল, এল মালেকন, কয়েকটি আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘর, ক্লাসিক্যাল কার, হাভানার সমুদ্র সৈকত ইত্যাদি। এগুলার মধ্যে পুরাতন হাভানা একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
১৯ টোকিও, জাপান:
জমকালো আধুনিকতা ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অপূর্ব শহর প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী শহর টোকিও, এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশ জাপানের রাজধানী, এমন একটি শহর যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা একসঙ্গে চলে চোখধাঁধানো স্কাইলাইন, ঝলমলে আলো, প্রযুক্তির অপার বিস্ময়, এবং শতবর্ষপ্রাচীন সংস্কৃতির অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে উঠাএই প্রাণবন্ত মহানগরী। টোকিওর রাস্তায় হাঁটলেই একদিকে চোখে পড়বে আকাশচুম্বী অট্টালিকা , স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমানব, সুপারফাস্ট ট্রেন, আর অন্যদিকে দেখা মিলবে চিরাচরিত কাঠের মন্দির, চেরিফুলের নরম সৌন্দর্য, আর শান্ত নিরিবিলি বাগান। এখানকার মানুষ সময়ানুবর্তী, সুশৃঙ্খল, ও পরিশ্রমী।
টোকিওর সংস্কৃতি তার খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, এবং বিনোদনের বিভিন্ন অনুসঙ্গের মধ্যেও গভীরভাবে প্রবাহিত। সুসি, রামেন, তেম্পুরার মতো জিহ্বায় জল এনে দেওয়া খাবার শুধু জাপানে নয়, সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। এখানকার ফ্যাশন দুনিয়া অনেক বৈচিত্র্যময়—হারাজুকু অঞ্চলে গেলে চোখে পড়বে রঙিন ও বৈচিত্র্যময় সব পোশাকশৈলী, যা টোকিওকে একটি ফ্যাশন রাজধানী হিসেবে পরিচিত করেছে।
জাপানি সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের আচার-অনুষ্ঠান। বসন্তে চেরি ফুল ফোটার সময় "হানামি" উৎসবে মানুষের পরিবার-পরিজন নিয়ে পার্কে বসে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা আর গ্রীষ্মের বিশাল আতশবাজির উৎসব রাতের আকাশকে রঙিন করে তোলে।
বিনোদনের কথা বললে, টোকিও বিশ্বব্যাপী অ্যানিমে ও মাঙ্গার জন্য বিখ্যাত। আকিহাবারা নামক এলাকা বিশেষভাবে প্রযুক্তিপ্রেমীদের ও অ্যানিমে ভক্তদের জন্য স্বর্গ। এছাড়াও, ডিজনিল্যান্ড, শিনজুকুর নৈশজীবন, এবং ঐতিহাসিক আসাকুসা মন্দির শহরটিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। টোকিও অতীত আর ভবিষ্যতের মেলবন্ধনে তৈরি এক অনন্য জীবনধারা। একবার এখানে গেলে এর উষ্ণ আতিথেয়তা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, আর আধুনিক জীবনের ছোঁয়া আপনাকে মুগ্ধ করবেই!
ঘুরে দেখা দুনিয়া: লরা বেগলির তালিকা (দ্বিতীয় পর্ব)
২০.অ্যান্টার্কটিকা: বরফের রাজ্যে জীবনের গল্প
অ্যান্টার্কটিকা;পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল, নির্জন, ও রহস্যময় মহাদেশ। বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়ে বরফে ঢাকা এই অঞ্চল যেন জনমানবহীন এক পরাবাস্তব জগৎ, কিন্তু প্রকৃতি ঠিকই বেঁচে আছে তার আপন ছন্দে।
এখানে সূর্য ছয় মাস ওঠে না, আর ছয় মাস কখনো অস্ত যায় না। এই অদ্ভুত দিন-রাতের খেলা অ্যান্টার্কটিকাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ৮০ ডিগ্রিতে নেমে যেতে পারে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও কল্পনারহিত। অ্যান্টার্কটিকার প্রকৃতি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি এখানকার জীববৈচিত্র্যও অসাধারণ। পেঙ্গুইন, সীল, তিমি, আর অদ্ভুত সব সামুদ্রিক প্রাণী এই বরফময় ভূমিকে জীবন্ত করে রেখেছে। পেঙ্গুইনদের সারিবদ্ধভাবে হাঁটা, বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া আর বরফের উপর খেলা করা যে কারো মন জয় করে নিতে পারে।
ঘুরে দেখা দুনিয়া: লরা বেগলির তালিকা (প্রথম পর্ব)
এখানকার পরিবেশ গবেষকদের জন্য এক আশ্চর্য জগত। বরফের গভীরে আটকে থাকা হাজার বছরের পুরনো বাতাস ও জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর অতীত জলবায়ু নিয়ে গবেষণার সুযোগ দেয়।আকাশ পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত হওয়ায় মহাকাশ গবেষণার জন্যও অ্যান্টার্কটিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানকার জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন। গবেষকরা যখন এখানে আসেন, তখন তাদের প্রচণ্ড ঠান্ডা, দীর্ঘ অন্ধকার, এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কাটাতে হয়। খাবার, পানি, ও বিদ্যুতের ব্যবস্থাও কঠিন ও সীমিত। কিন্তু প্রকৃতির এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও যারা এখানে থাকেন, তারা প্রতিদিন নতুন নতুন বিস্ময়ের সাক্ষী হন। অ্যান্টার্কটিকা নিছক এক বরফাবৃত রাজ্য নয়, এটি প্রকৃতির অনন্য রহস্যভরা জগৎ, যেখানে জীবনে টিকে থাকার গল্প এক বিষ্ময়কর সংগ্রাম আর অনুপ্রেরণার প্রতীক।